1. info@businessstdiobd.top : admin :
সোমবার, ১৭ মে ২০২১, ০১:৩৬ পূর্বাহ্ন




সম্ভাবনাময় অয়েলপাম চাষ!

নানা সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। কৃষিতেও রয়েছে সম্ভাবনার অবারিত দিগন্ত। এমনি এক সম্ভাবনার নাম মালয়েশিয়ার ফসল অয়েল পাম চাষ। দেশে খাদ্য শস্যের নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি বর্তমানে ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা অন্যতম সমস্যা। বাংলাদেশে খাবার তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি বড় ঘাটতি আছে। বর্তমানে ভোজ্য তেলের চাহিদা প্রায় ১২ লক্ষ মেট্রিক টন। অভ্যন্তরীন তেল উৎপাদনে বিদ্যমান ঘাটতির কারণে প্রতিবছর বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে তেল বীজ ও তেল আমদানী করতে হয়। ভোজ্য তেলের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। যা ২০০৭-০৮ সালে দাড়িয়েছে ১৩ লক্ষ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদিত খাবার তেল দিয়ে দেশের মোট চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ পূরণ করা যায়। বাকি শতকরা ৮৫ শতাংশ তেলের জন্য বিদেশের উপর নির্ভর করতে হয়। দেশে পাম ও সয়াবিন তেল আমদানী করতে ১২০০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়।

বাংলাদেশে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থার আলোকে ভোজ্য তেল (সয়াবিন, সরিষা, তিল, তিষি, সূর্যমুখি, ইত্যাদির) এর অভ্যন্তরিন ঘাটতি মেটানো অত্যন্ত দুষ্কর। কেননা ভোজ্য তেলের উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। ধরা যাক, যদি বর্তমানে ভোজ্য তেল উৎপাদনের পরিমাণ ৩ গুণ পর্যন্তও বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়, তাহলেও দেশে উৎপাদিত খাবার তেল দ্বারা মোট চাহিদার মাত্র ৪৫ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব। অন্যদিকে প্রচলিত তৈলবীজ চাষাবাদের মাধ্যমে ভোজ্য তেলের বাৎসরিক চাহিদা পূরণ করার জন্য যে পরিমাণ কৃষি জমির প্রয়োজন তা আমাদের পক্ষে যোগান দেয়া অসম্ভব। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্প কারখানা স্থাপন এবং নদী ভাঙ্গনের মতো নানাবিধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে প্রতিদিন ২২২ হেক্টর আবাদি জমি হ্রাস পাচ্ছে। দেশে জনসংখ্যা বিচারে জনপ্রতি চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ০.১ হেক্টর। ফলে বছরে ৬৫ হাজার হেক্টর কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। কার্যত খাদ্য শস্য ঘাটতি মেটানোর জন্য বেশিরভাগ কৃষি জমি ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অবস্থায় তৈল ফসলের জন্য আবাদী জমির পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব নয়।

পাম চাষের গুরত্ব/উপযোগীতা
এ প্রেক্ষাপটে খাবার তেল চাহিদা পূরণে অয়েল পাম চাষ বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় আনতে পারে যুগান্তকারী পরিবর্তন। কেননা পাম চাষ খুব লাভজনক। নিম্নে পাম চাষের উপযোগীতা উল্লেখ করা হলো-

অল্প জায়গা প্রয়োজন
অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী ফসলের তুলনায় পাম চাষের জন্য খুব অল্প জায়গা প্রয়োজন। বছরে ১ হেক্টর জমিতে ৫ টন থেকে ৮ টন বা তার বেশি পরিমাণ পাম তেল উৎপন্ন হয় যা অন্যান্য যে কোন তেল উৎপাদনকারী ফসলের চেয়ে বেশি লাভজনক।

অকৃষি জমিতে পাম চাষ
পাম চাষ দেশের অকৃষি জমিতেই করা সম্ভব। উঁচু জমির আইল, শিক্ষাঙ্গনের পতিত জমি, ক্যান্টনমেন্ট,
রাস্তার দু ধারে পাহাড়ী অঞ্চলের পাদভূমির বিশাল এলাকা, অন্যান্য অব্যবহৃত জমি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পতিত জমি এ চাষের আওতায় আনা সম্ভব। পাম চাষের মাধ্যমে দেশে অভ্যন্তরীন খাবার তেলের চাহিদা পূরণের জন্য ২ লক্ষ ৬০ হাজার অকৃষি জমি পাওয়া একটি সহজ লভ্য বিষয়।

উপযোগী আবহাওয়া
বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাটি ও আবহাওয়ার সাথে যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে বিধায় বাংলাদেশে পাম চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের ৮০ ভাগ পাম অয়েল মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় উৎপাদিত হয়। গ্রীস্ম মন্ডলীয় গরম ও আদ্র আবহাওয়া পাম চাষের উপযোগী। পাম চাষের জন্য সাধারণত ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সর্বোত্তম। গাছের পরিপূর্ণ বৃদ্ধি তথা ভাল চাষাবাদের জন্য দিনে অন্তত ৫-৭ ঘন্টা আলো প্রয়োজন। মালয়েশিয়ায় সর্বাধিক পরিমাণ পাম উৎপাদনকারী অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১৮৫০ মি.মি এবং খরা মৌসুমে অন্তত মাসিক ১০০ মি.মি। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার আবহাওয়ার মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। দেশের উত্তর-পূর্বাশ ও দক্ষিণ পূর্বাংশের গড় বাৎসরিক বৃষ্টিপাত ৩০০০ মি.মি এর বেশি। বর্ষাকালে সর্বাধিক পরিমাণে বৃষ্টি হয় এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ৮০ শতাংশের বেশি থাকে। শীতকালে দেশের তাপমাত্রা সাধারণত ১৫-২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং গ্রীস্মকালে ২৮-৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস থাকে যা পাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী।

সারা বছর কর্মসৃজন
রোপনের ৩য় বছর থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত লাভজনক ফল দেয়। যে কোন দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য একটি আয় বর্ধক ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অয়েল পাম সারা বছরই ফল দেয় বিধায় এর উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে জড়িত শ্রমিকদের সারা বছরই কর্মে জড়িত থাকার সুযোগ থাকে।

অয়েল পামের তুলনামূলক পুষ্টিমান
বিভিন্ন রকমের উদ্ভিজ্জ ভোজ্য তেলের মত পাম কোলেষ্টরেল মুক্ত। যুক্তরাষ্ট ও যুক্তরাজ্যের ষ্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ভোজ্য তেলের মধ্যে ৫০ পি.পি.এম পর্যন্ত কোলেষ্টরেল থাকলে তা কোলেষ্টরেল মুক্ত তেল হিসেবে বিবেচিত হয়। পাম তেলের মধ্যে ১৩-১৯ পি.পি.এম পর্যন্ত কোলেষ্টরেল থাকে। অপরদিকে সয়াবিন তেলে ২০-৩৫ পি.পি.এম সূর্যমূখী তেলে ০৮-৪৪ পি.পি.এম এবং সরিষার তেলে ২৫-৮০ পি.পি.এম পর্যন্ত কোলেষ্টরেল বিদ্যমান। এই বিবেচনায় পাম তেল অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেলের চেয়ে অতিউত্তম। চীনে পাম তেল, সয়াবিন তেল, পিনাট তেল এবং শুকরের চর্বি নিয়ে তুলনামূলক এক গবেষণায় দেখা গেছে এদের মধ্যে পাম তেল দেহে উপকারী এইচ ডি এল কোলেষ্টরেল এর মাত্রা বাড়ায় এবং ক্ষতিকর এল ডি এল কোলেষ্টরেল এর মাত্রা কমায়। লাল পাম তেলে প্রচুর পরিমাণে বিটা ক্যারোটিন এবং ভিটামিন ই থাকে। যা গাজরের চেয়ে ১৫ গুণ এবং টমটোর চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি।

আবাদ করার উপায়:
সুনিস্কাশিত সমতল, ভারী মাটি, পানি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পলিমাটি পাম চাষের জন্য আদর্শ জমি। বাংলাদেশের কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিলেট, দিনাজপুর, চট্রগ্রাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম সহ ৩০ টি কৃষি জলবায়ু অঞ্চলের মধ্যে ২৭ টি কৃষি জলবায়ু অঞ্চলে পাম আবাদ করা যায়।
প্রথমে বীজ থেকে চারা তৈরী করে নিতে হয়। বীজ থেকে চারা তৈরী করে নিতে প্রায় ১ বছর সময় লাগে। চারা তৈরীর পর মূল জমিতে ৯.৫ মিটার দূরে দূরে প্রতি হেক্টর জমিতে ১২৮ টি চারা রোপন করতে হবে। চারা রোপনের পূর্বে ৯.৫ মিটার দূরে দূরে ২ ফুট ী ২ ফুট ী ২ ফুট আকারের গর্ত তৈরী করতে হবে। মূল গর্তে চারা রোপনের পূর্বে প্রায় ১০ কেজি জৈব সার দিয়ে ভাল করে উলট পালট করে পচিয়ে নিতে হবে। তারপর প্রতি গর্তে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১ কেজি টিএসপি, এবং ৫০০ গ্রাম এমপি সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। এসব সার মাটিতে দিয়ে চারা রোপন করতে হবে। পরে প্রয়োজন মত সেচ দিতে হবে।

বালাই ব্যবস্থাপনা
পাম গাছে ইঁদুরের আক্রমন হতে পারে সে জন্য শতকরা ২ ভাগ জিংক ফসফাইট বিষটোপ ব্যবহার করা যেতে পারে। গন্ডার পোকার আক্রমনে গাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়। গোঁড়া পচা রোগের কারণে শতকরা ৫০ ভাগ পর্যন্ত ফলন কমে যেতে পারে। এছাড়া বাগওয়ার্ম ও ক্যটারপিলারের আক্রমন রোধ করার জন্য জৈব বালাইনাশক ব্যাকটোরিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে।

ফসল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
সারা বছরই পাম গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা যায়। তবে লাগানোর ২৬-৩০ মাসের মধ্যেই ফসল তোলা যায়। এক হেক্টর জমির পূর্ণ বয়স্ক গাছে গড়ে বছরে কাঁিদ সহ প্রায় ১৯ টন ফল পাওয়া যায়। মাসে ৩ বার বা ১০ দিন পরপর ফল সংগ্রহ করা যায়। এরপর ফলগুলোকে পাত্রের মধ্যে পানিসহ ফুটাতে হবে। এতে ফলগুলো নরম হবে। এ নরম ফলগুলোকে চেপে রস বের করে একটি পাত্রে রেখে চুলায় কিছুক্ষণ জ্বাল দিলে রসে বিদ্যমান পানি বাস্পাকারে বের হয়ে যাবে এবং পাত্রে তেল জমা থাকবে। এভাবে তেল ছেঁকে বোতলে সংগ্রহ করে ছয় মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।

কৃষিবিদ মোঃ নুরুল হুদা আল মামুন।
তথ্যসুত্র: কৃষি সংবাদ ডটকম।




আরো পড়ুন




© All rights reserved © 2019 Business Studio
Theme Developed BY Desig Host BD