1. info@businessstdiobd.top : admin :
বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন

ক্যাম্পাস ভবনের ভেতর অন্য ভুবন!

উঁচু ভবনগুলো বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, ভেতরে ছেলেমেয়েদের একটা ভিন্ন জগৎ আছে। আছে ভিন্ন ভিন্ন গল্প। রাজধানীর বনানীতে তিনটি ভবন নিয়ে প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসেন। কেউ নাটোর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা বা বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছেন, আত্মীয়স্বজনের বাসায় কিংবা মেসে থেকে পড়ালেখা করছেন। কেউ প্রতিদিন ভোরের ট্রেন ধরে ক্লাস করতে আসেন নারায়ণগঞ্জ থেকে। ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের বাহন ব্যক্তিগত গাড়ি। আবার নিজের খরচে লেখাপড়া করছেন; হয়তো সারা রাত নাইট ডিউটি করে সকালে ঘুম ঘুম চোখে ক্লাসে এসেছেন, এমন শিক্ষার্থীর দেখাও আপনি পাবেন। গলায় পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে, ক্যাম্পাসের ভেতর পা রাখামাত্র তাঁদের সবার পরিচয় এক হয়ে যায়—সবাই প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। বন্ধু, সহপাঠী। এটা অন্য জগৎ নয় তো কী!

২০০৩ সালে যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৩৩। এখন সেটা প্রায় সাড়ে চার হাজারে দাঁড়িয়েছে। পূর্ণকালীন শিক্ষক আছেন ১৯২ জন। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন প্রাইমএশিয়ার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার গ্র্যাজুয়েট। তাঁরাই তো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় বিজ্ঞাপন।

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের আওতায় শিক্ষার্থীরা এখানে বিবিএ, এমবিএ ও ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট পড়ছেন। বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে আছে মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন ও ফার্মেসি। প্রকৌশল অনুষদের অধীনে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল এবং স্থাপত্য বিভাগে পড়ার সুযোগ আছে। মাইক্রোবায়োলজি ও ফার্মেসিতে স্নাতকোত্তর করা যায়। এ ছাড়া আইন বিভাগে ছাত্রছাত্রীরা এলএলবি (স্নাতক) পড়ছেন।

আমাদের ‘প্রাইমএশিয়া ভ্রমণ’ শুরু ক্যাম্পাসের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ভবন থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়টির এই বিভাগটির বেশ সুনাম আছে, সে কথা শিক্ষার্থী, শিক্ষক—সবার কাছেই শুনেছি। ভেতরে ল্যাবগুলো ঘুরে কারণটা অনুমান করা গেল। পোশাক কারখানার ঢাউস আকৃতির যন্ত্রপাতিগুলো ক্যাম্পাসের ছোট দরজাটা দিয়ে কীভাবে ভেতরে ঢুকে পড়েছে, কে জানে! এই সব যন্ত্রপাতি দেখে, হাতে-কলমে কাজ করে কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এখানেই শেষ নয়, মাঝেমধ্যে তাঁরা দল বেঁধে চলে যান কারখানা পরিদর্শনে। জানালেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পঞ্চম সেমিস্টারের ছাত্রী কামরুন নাহার।

কদিন আগে, ক্লাস থেকে তাঁরা পাঁচজনের একটা দল গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানা ঘুরে এসেছেন। পড়ালেখা শেষ করে কী করতে চান? প্রশ্ন শুনে কামরুন নাহার ভাবনায় পড়ে গেলেন। মনে হলো, এখনো নিজের লক্ষ্যটা ঠিক করতে পারেননি। তবে এই প্রশ্নের একটা ঝটপট উত্তর পাওয়া গেল মহিউদ্দিন শাকিলের কাছে। একই বিভাগে চতুর্থ সেমিস্টারে পড়ছেন তিনি। বললেন, ‘আমাদের এক স্যার পাট নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁকে দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। ইচ্ছা আছে, আমিও পাট নিয়ে কাজ করব। যেহেতু বাংলাদেশে পাটের একটা বড় সম্ভাবনা আছে।’ বটে, সম্ভাবনার ছায়া দেখা গেল শাকিলের চোখেমুখেও।

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ভবন থেকে বিদায় নিয়ে এবার আমরা অন্য ভবন, অন্য বিভাগগুলো ঘুরে দেখি। বায়োকেমিস্ট্রির ক্লাসে একদল শিক্ষার্থী বসে ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লাস শুরু হবে। এই ফাঁকে চট করে একটু আলাপ সেরে নিলাম। বায়োকেমিস্ট্রি বিষয়টা খটমটে হলেও তাঁরা নাকি বেশ আনন্দ নিয়েই পড়েন। এই বিভাগ থেকে যেসব সিনিয়র পাস করে বেরিয়ে গেছেন, এখন অনেকেই ভালো অবস্থানে আছেন। তাই ভবিষ্যৎ নিয়েও বায়োকেমিস্ট্রির শিক্ষার্থীরা খুব একটা চিন্তিত নন। আপনাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট কার? প্রশ্ন শুনে সবাই যাঁর দিকে আঙুল তুললেন, তাঁর নাম খাদিজা রেজওয়ানা। তাঁর সিজিপিএ ৩.৯৭। খাদিজা নারায়ণগঞ্জ থেকে আসেন, মাঝেমধ্যে ঢাকায় থেকেও ক্লাস করেন। তিনি বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে তাঁর শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা।

মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে দেখা হলো মো. জুলফিকার আলী, আবু সায়েম ও ফাহিমা জাহানের সঙ্গে। এই তিনজনের গল্প একটু অন্য রকম। এসএসসির পর তাঁরা তিন বছরের ডিপ্লোমা করেছেন। এখন স্নাতকের জন্য ভর্তি হয়েছেন প্রাইমএশিয়ায়। মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স, প্যাথোলজি কিংবা প্রকৌশল…নানা বিষয়ে ডিপ্লোমা করে অনেকেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকের জন্য ভর্তি হন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ডিপ্লোমা করা ছাত্রছাত্রীদের জন্য এখানে টিউশন ফির ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থাও আছে।

জুলফিকার আর আবু সায়েম দুজনই বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন। কখনো কখনো নাইট ডিউটি থাকে। কাজের চাপ না থাকলে তাঁরা হাসপাতালে বসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াটা সেরে নেন। এত পরিশ্রম করতে কষ্ট হয় না? নাটোরের ছেলে জুলফিকার আলী খুব সুন্দর উত্তর দিলেন, ‘ডিপ্লোমা করার সময় বাসা থেকে টাকা নিতাম। এখন নিজের খরচে পড়ি। নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে পারছি, এটাই আনন্দ।’

পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন বিষয়ে পড়ার আনন্দটা কোথায়? বিভাগটির ছাত্রছাত্রীরা সবাই এক বাক্যে জানালেন, তাঁদের পছন্দের পড়ার বিষয় হলো ‘ডায়েটেটিকস’। কীভাবে সঠিক ডায়েট অনুসরণ করে সুস্থ থাকা যায়, এসব তাঁদের পড়ার অংশ। ডায়েটিটিকস বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার সুযোগ দেশে নেই। কয়েকজন জানালেন, বিদেশ থেকে স্নাতকোত্তর করে এসে তাঁদের ডায়েটিশিয়ান হওয়ার ইচ্ছা। প্রাইমএশিয়ার একেক তলাজুড়ে একেক বিভাগ। ঘুরে ঘুরে আরও অনেকের সঙ্গেই কথা হলো। সবার চোখই স্বপ্নিল। সিঁড়িতে বসে যে দলটা আড্ডা দিচ্ছিল, একটু আক্ষেপের সুর টের পাওয়া গেল তাদের কণ্ঠে—‘আমাদের এখানে পড়ার মান ভালো, পরিবেশ ভালো। শুধু একটা স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকলে ভালো হতো।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল হান্নান চৌধুরী ছাত্রছাত্রীদের আক্ষেপটা বোঝেন। তিনি বলছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চাপের কারণে নয়, আমরা নিজেদের স্বার্থেই স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে ভীষণ আগ্রহী। স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য আমরা জায়গা কিনে রেখেছি আরও ১০ বছর আগে। কিন্তু রাজউকের ভবন নির্মাণের অনুমোদনসহ নানা প্রশাসনিক জটিলতায় ক্যাম্পাস তৈরির কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও মন্ত্রণালয় আমাদের সমস্যা সম্পর্কে অবগত। তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। আশা করি শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে। আমরা নিজেদের একটা ক্যাম্পাস পাব।’ প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে আরও জানতে ঢুঁ মারতে পারেন তাদের ওয়েবসাইটে: www.primeasia.edu.bd

ক্লাসরুমের বাইরেও মেধা বিকাশের উপায় আছে: আবদুল হান্নান চৌধুরী, উপাচার্য, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি
গতানুগতিক বিষয়গুলোতে পড়াশোনার বাইরে আমরা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের আরও বড় পরিসরের জন্য প্রস্তুত করতে চাই। আমাদের এখানে যেমন বিবিএ, এমবিএর পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট কিংবা পাবলিক হেলথ নিউট্রিশনের মতো বিষয়গুলোও আছে। প্রাইমএশিয়ার বয়স তো খুব বেশি নয়। এরই মধ্যে আমাদের যা অগ্রগতি হয়েছে, আমরা একটা আত্মপরিচয় দেওয়ার মতো জায়গায় পৌঁছেছি। আমাদের ৫২টা ল্যাব আছে। নিয়মিত সভা, সেমিনার হচ্ছে। জার্নাল বের করার জন্যও আমরা কাজ করছি। বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বাড়ছে। দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য প্রাইমএশিয়া শুধু যে ভালো ছাত্রছাত্রী তৈরি করতে চায়, তা নয়। তরুণ শিক্ষকদের আত্মোন্নয়নের জন্যও এটা একটা ভালো প্ল্যাটফর্ম। আমাদের শিক্ষকেরা বিদেশে পিএইচডির জন্য যাচ্ছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই দেশের জন্য অবদান রাখবেন।

গুণগত শিক্ষাদান এবং শিক্ষা কার্যক্রমের উন্নয়নের জন্য আমরা ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করছি। আমি বিশ্বাস করি, ক্লাসরুমে অর্জিত শিক্ষার বাইরেও মেধা বিকাশের অনেক উপায় আছে। তাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টা ক্লাবের মাধ্যমে সহশিক্ষা কার্যক্রমে আমরা ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহিত করছি। আমি মনে করি, পড়ালেখার পাশাপাশি দেশাত্মবোধ, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতির চর্চা—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো ডটকম।

আরো পড়ুন
© All rights reserved © 2019 Business Studio
Theme Developed BY Desig Host BD