1. info@businessstdiobd.top : admin :
শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১, ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন




গরু-ছাগলে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ

সংকট থেকে যে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে, তার বড় উদাহরণ বাংলাদেশের গবাদি পশু খাত। চার বছর আগেও দেশের চাহিদার বড় অংশ মিটত প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করে। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ করে দেয়। এতেই বাজারের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে গবাদিপশুর লালনপালন ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। গরু ও ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।

শুধু কোরবানি ঈদের আগে দেশে ২০ থেকে ২২ লাখ গরু-ছাগল বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশে আসত। সারা বছরে এই সংখ্যা ৩০ লাখে ছুঁয়ে যেত। ভারত থেকে গবাদিপশু আসা বন্ধ হওয়ার পর দেশে প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে গবাদিপশুর খামার বাড়ছে। ছোট–বড় মিলিয়ে এখন খামারের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। গত তিন বছরে দেশে গরু-ছাগলের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ লাখ। পাশাপাশি মহিষের উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

চার বছর আগেও শুধু কোরবানির ঈদের সময় প্রায় ২২ লাখ গরু-ছাগল ভারত ও মিয়ানমার থেকে এসেছিল। গত ঈদে এসেছিল মাত্র দেড় লাখ। গত তিন বছরে চিত্র এমনই পাল্টেছে যে গত কোরবানির ঈদের হাটে প্রায় ১২ লাখ গরু-ছাগল অবিক্রীত ছিল।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছি, গবাদিপশু পালনে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন হয়। একই সঙ্গে দেশের মাংসের চাহিদা মেটে, বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয় হয়। ফলে গবাদিপশুর সংখ্যা বৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি, বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতিকে বদলে দিচ্ছে।’

গরু-ছাগলের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবে এ খাতে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থানেরও উন্নতি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাগলের সংখ্যা, মাংস ও দুধ উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সূচকে ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে। এই খাতে শীর্ষে রয়েছে ভারত ও চীন।

বাংলাদেশ ছাগলের দুধ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়। আর ছাগলের সংখ্যা ও মাংস উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। সামগ্রিকভাবে ছাগল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ হচ্ছে ভারত ও চীন। আর গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া মিলিয়ে গবাদিপশু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের ১২তম। শুধু উৎপাদনের দিক থেকেই নয়, গবাদিপশুর জাতগত বৈচিত্র্যের দিক থেকেও বাংলাদেশকে বেশ সমৃদ্ধিশালী দেশ বলছে এফএওসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ২০১৫ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের যমুনাপারি ছাগলকে বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত হিসেবে মনে করছে সংস্থা দুটি।

পিকেএসএফের সহায়তায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে ছাগল লালনপালন নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা ওয়েব ফাউন্ডেশন। তাদের হিসাবে, শুধু চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও রাজশাহীতে ২০ হাজার খামারে প্রায় ৫০ লাখ ছাগল লালনপালন করা হচ্ছে। এসব ছাগলের অধিকাংশই বাংলাদেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের। পিকেএসএফের অর্থায়নে চলতি বছর গরু লালনপালন করা হয়েছে ১০ লাখ। যেগুলোর আবার বিমাও করা হয়।

গরু আমদানি কমে যাওয়ায় দেশি জাতের গরুর খামার করার হার বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কোরবানি ঈদে দেশি গরুর বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় এবং ভালো দাম পাওয়ায় এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বাংলাদেশের গবাদিপশুর জাতগত বৈচিত্র্য নিয়ে একটি গবেষণা করছেন। তাতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের গরুর চারটি জাত বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উন্নত জাত। চট্টগ্রামের লাল গরু, পাবনা গরু, উত্তরবঙ্গের ধূসর গরু ও মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিমের গরুর মাংসের মান ও স্বাদ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সেরা।

জানতে চাইলে ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশের গরু-ছাগল ছাড়াও ভেড়া, ঘোড়া ও মহিষের অনেকগুলো ভালো জাত আছে। সেগুলো থেকে উন্নত মানের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব। বিদেশ থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়াকে ইতিবাচক বর্ণনা করে তিনি বলেন, দেশে নতুন নতুন গরুর খামার গড়ে উঠছে। সেখানে দেশি জাতের গরু-ছাগল পালিত হচ্ছে। এতে একই সঙ্গে দেশি জাতগুলো রক্ষা পাচ্ছে এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।

বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসায় গরু–ছাগল লালনপালন, বিশেষ করে কেনাবেচায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে গেছে। লালনপালনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে এই খাতে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পিকেএসএফ।

এ বছর শুধু পিকেএসএফের মাধ্যমে উৎপাদন হওয়া ১০ লাখ গরুর মধ্যে ৬ লাখ গরু বিক্রি হচ্ছে অনলাইন, সরাসরি খামার থেকে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে দুই লাখ গরু।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান বলেন, ‘সরকারের উচিত বিদেশ থেকে গরু আমদানি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। আর দেশি জাত উন্নয়নের গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো। তাহলে দেশি জাত দিয়েই আমরা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব।’ তথ্যসূত্র: প্রথমআলো




আরো পড়ুন




© All rights reserved © 2019 Business Studio
Theme Developed BY Desig Host BD