1. info@businessstdiobd.top : admin :
রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন

ব্যাংকের চাকরী ছেড়ে প্লাষ্টিক বোতল থেকে তুলা তৈরীর ব্যবসা!

ব্যতিক্রমী কিছু করার ইচ্ছা থেকে আবুল কালাম মোহাম্মদ মূসা নিলেন ভীন্নধর্মী এক পরিবেশ বান্ধব উদ্যোগ। প্লাস্টিকের ফেলনা বোতল থেকে উৎপাদন করলেন তুলা। এই তুলা রফতানির মাধ্যমে বছরে দুইশ কোটি টাকা আয়ের পথ তৈরি হয়েছে। ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের নিভৃত পল্লী পানিয়াশাইল। আঁকাবাঁকা মেঠোপথ পাড়ি দেওয়ার পর দেখা মেলে একটি কারখানার।

১০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা মূমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে এই কারখানার চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত। ২৪ ঘণ্টা ঘুরছে কারখানার চাকা, কিন্তু বাইরে কোনো ধোঁয়া নেই। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন চারপাশ। পুরো কারখানা ঘুরে দেখালেন কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম মোহাম্মদ মূসা।

পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে তোলা এবং ফেলনা প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তুলা তৈরির গল্প শুনতে চাচ্ছিলাম আমরা। তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন কারখানার ওপরে একটি রুমে। সেখানে বসে তিনি মেলে ধরলেন তার জীবনের গল্প। পাশেই বসা ছিলেন স্ত্রী নুসরাত জাহান ও একমাত্র মেয়ে মাইমুনা আঞ্জুম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি নিলেন ব্যাংকে। কিন্তু সেই চাকরি কিছুতেই ভালো লাগছিল না তার। এক পর্যায়ে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে কিছুদিন শ্বশুরের ব্যবসায় বসলেন। সেখানেও মন বসছে না। স্বপ্ন ছিল ব্যতিক্রম কিছু করে দেশের সুনাম বয়ে আনবেন। ব্যতিক্রমী ব্যবসার খোঁজে চলে গেলেন চীন।

সেখানে গিয়ে দেখলেন, একটি কারখানায় পরিত্যক্ত পল্গাস্টিকের বোতল থেকে তুলা তৈরি হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এমন ব্যবসা বেশ পছন্দ হলো মূসার। কিন্তু এই ব্যবসা চালু করা বেশ ব্যয়বহুল। অভিনব এই ব্যবসার স্বপ্ন মাথায় নিয়ে তিনি বাংলাদেশে চলে এলেন। দেশে এসেই টাকার খোঁজে দ্বারে দ্বারে ঘুরলেন।

কিন্তু সবাই ব্যবসার ধারণা শুনেই ‘পাগলামি’ বলে আখ্যা দিলেন। অনেকে তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টাও করলেন। এতে মোটেও দমে যাননি মূসা। এক পর্যায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষসহ সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিদের তিনি ব্যবসার ধারণা বোঝাতে কিছুটা সক্ষম হয়েছেন। ব্যাংকও টাকা দিতে রাজি হলো। ব্যাংক ও নিজের টাকা দিয়ে শুরু করে দিলেন কারখানা। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিল উৎপাদিত পণ্য দেশের বাইরে পাঠানো নিয়ে।

ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই তুলা বাইরে পাঠাতে চাচ্ছিল না। কয়েকটি চালান আটকে গেল। মূসার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। একদিকে ব্যাংক লোন, অন্যদিকে ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হন।

সেই থেকেই বিদেশের মাটিতে মূসার স্বপ্নযাত্রা শুরু। প্রথম চালানেই ২০০ টন পণ্য চীনে পাঠালেন তিনি। তারা আরও পণ্য চাচ্ছে। এদিকে কারখানার চাকা ঘুরছে, দিনে ৪০ টন পণ্য উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন না থাকায় উৎপাদন হচ্ছে ৩৫ টন। চীনা প্রযুক্তিতে রি-সাইকেল করে তৈরি তুলা বাংলাদেশ থেকে রফতানি করে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আয়ের পথ তৈরি হয়েছে।

সংগ্রাম-সফলতার গল্প শোনাতে শোনাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন মূসা। তিনি যেন ক্লান্ত-শ্রান্ত। এক পর্যায়ে বলতে থাকেন, ‘বহু লড়াইয়ের পর আমি আজ সফল। সফল না হলে আমি পথে বসে যেতাম। আমি আমার এই ব্যবসাকে আরও বড় করতে চাই। সারা বিশ্বে পণ্য পাঠাতে চাই।’ অবশ্য ইতিমধ্যে বিদেশে পণ্য রফতানির স্বীকৃতিও তিনি পেয়ে গেছেন।

তার কারখানা রি-সাইকেল ক্লেইম স্ট্যান্ডার্ড (আরসিএস) সার্টিফিকেট পেয়েছে। সার্টিফিকেট পাওয়ার মাধ্যমে মূমানু পলিয়েস্টার ইন্ডাস্ট্রিজের উৎপাদিত পণ্য পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবারের (পিএসএফ) রফতানি বাজার ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপানসহ অন্যান্য দেশে উন্মোচিত হলো।

যেভাবে পাওয়া যায় তুলা : পানি খাওয়ার পর ফেলে দেওয়া স্বচ্ছ বোতল সংগ্রহ করা হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে। এই পেট বোতল ছোট ছোট করে কেটে ফ্লেক্স তৈরি করা হয়। এরপর গরম পানি দিয়ে সেই ফ্লেক্স ধোয়া হয়। উচ্চ তাপ ও চাপে সেই ফ্লেক্স আট ঘণ্টা বায়ুনিরোধক ড্রামে রাখা হয়।

ভ্যাকুয়াম ড্রামে তাপ দেওয়ার পর তৈরি হয় পেস্ট। সেই পেস্ট স্পিনারেট দিয়ে স্নাইবার করা হয়। এরপর তা সূক্ষ্ণ সুতার আকারে বেরিয়ে আসে। ওই সুতা আবার বিভিন্ন আকারের কাটিং করে মেশিনে ঢোকানোর পর পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (পিএসএফ) হিসেবে সাদা তুলা বেরিয়ে আসে।

উৎপাদিত তুলা বাজারে বিক্রি করা কার্পাস তুলার মতোই মোলায়েম ও মসৃণ। পল্গাস্টিক বোতল থেকে তুলা তৈরির এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর রফতানির উদ্দেশ্যে মেশিনেই তা প্যাকেজিং করা হয়।

আবুল কালাম মোহাম্মদ মূসা বলেন, এ ধরনের কারখানা গড়ার পেছনে দুটো উদ্দেশ্য কাজ করেছে। তুলা তৈরির কাঁচামাল হিসেবে পল্গাস্টিকের ফেলে দেওয়া বোতল ব্যবহার করায় পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কারখানার কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে প্রথম স্থাপিত এ ধরনের কারখানা থেকে দৈনিক প্রায় ৪০ টন তুলা উৎপাদন হচ্ছে, যা শিগগিরই ৮০ টনে উন্নীত হবে। প্রতি কেজি পিএসএফের রফতানি মূল্য এক ডলার হলেও দৈনিক প্রায় ৮০ হাজার ডলারের তুলা উৎপাদনে সক্ষম ওই কারখানাটি। তবে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটিতে সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

বর্তমানে সরকার পেট বোতল ফ্লেক্স রফতানিতে ১০ শতাংশ হারে ভর্তুকি দিচ্ছে। কারখানা সংশ্নিষ্টরা পেট বোতল ব্যবহার করে তুলা উৎপাদন করার ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন করছেন। ফলে এই খাতে তারা ২০ শতাংশ রফতানি ভর্তুকির সুযোগ চান সরকারের কাছে। তথ্যসূত্র: সমকাল।

আরো পড়ুন
© All rights reserved © 2019 Business Studio
Theme Developed BY Desig Host BD