1. info@businessstdiobd.top : admin :
রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ১০:১১ পূর্বাহ্ন

মানুষের শেষ ঠিকানার কারিগর!

মানুষের অন্তিম যাত্রায় একান্ত সহযোগীর নাম মনু মিয়া। মনের গহিনের পরম দরদ আর অপার ভালোবাসা দিয়ে তিনি সাজান মুসলিম সম্প্রদায়ের শেষ ঠিকানা- কবর। কারও মৃত্যু সংবাদ কানে আসামাত্রই খন্তা, কোদাল, ছুরি, করাত, দা, ছেনিসহ সহায়ক সব যন্ত্রপাতি নিয়ে ছুটে যান কবরস্থানে।

এভাবেই কবর খননের কাজ করে তিনি পার করে দিয়েছেন তার ৬০ বছরের জীবনের সুদীর্ঘ ৪২টি বছর। কোনো ধরনের পারিশ্রমিক কিংবা বকশিশ না নিয়ে এ পর্যন্ত খনন করেছেন দুই হাজার ৬২৫টি কবর।

দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে নিজের ধানিজমি বিক্রি করে কিনেছেন একটি ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে তুলে নেন তার যাবতীয় হাতিয়ার-যন্ত্র। সেই ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই শেষ ঠিকানা সাজাতে মনু মিয়া এখন ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামে।

কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম মনু মিয়ার। পিতা আবদুল হেকিম মিয়া এবং মাতা সারবানুর দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে মনু মিয়া তৃতীয়। হাসিখুশি আর হৈ-হুল্লোড়ে মেতে থাকা মনু মিয়ার জীবনে হঠাৎ ঘটে ছন্দপতন।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে মনু মিয়া তার মাকে হারান। মায়ের কবরে বাবা, বড় ভাই আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে এক মুঠো মাটি দিয়ে তাকে শেষ বিদায় জানানোর সময়েও মনু মিয়া বুঝতে পারেননি, তাকে কতটা স্নেহবঞ্চিত করে চলে গেছেন মা! ব্যাকুল হৃদয়ে মায়ের কবর জিয়ারতের জন্য ছুটে যেতেন কবরস্থানে। কবরস্থানে এভাবে যাওয়া-আসা থেকেই স্থানীয় গোরখোদকদের সঙ্গে মনু মিয়া একদিন কবর খননের কাজে অংশ নেন।

প্রথম সেদিনের কথা বলতে গিয়ে মনু মিয়া বলেন, আমি তখন কিছুই বুঝতে পারিনি। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, আমি যেন আমার মায়ের শেষ ঠিকানাটা সাজিয়ে দিচ্ছি। এরপর থেকে যখনই সুযোগ পেয়েছি, তখনই তাদের সঙ্গে কবর খননের কাজে অংশ নিয়েছি। এভাবে একসময় এ কাজটার প্রতি আমার অন্যরকমের একটি ভালো লাগা জন্মে গেল।

মনু মিয়া জানান, ছোটবেলায় স্থানীয় গোরখোদকদের সঙ্গে প্রথম প্রথম আত্মীয়স্বজনের কবর খননের কাজে অংশ নিতেন। ক্রমেই দক্ষতা বাড়তে বাড়তে এক সময় এ কাজটিকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর থেকে টানা ৪২ বছর ধরে অকৃত্রিম আবেগে তিনি নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন কবর খননের কাজে।

একজন নিখুঁত সুদক্ষ গোরখোদক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইনসহ পাশের এলাকাগুলোয়। কবর খনন করার জন্য নিজের খরচায় তিনি খন্তা, কোদাল, দা, করাতসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করে নিয়েছেন। কবর খোঁড়ার বিনিময়ে কারও কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেন না। এমনকি যাতায়াত খরচটুকুও না।

মনু মিয়া জানান, তিনি ঢাকার বনানী কবরস্থানসহ দেশের নানা প্রান্তে এ পর্যন্ত দুই হাজার ৬২৫টি গোর খনন করেছেন। কোথাও বেড়াতে গিয়ে যদি কারও মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছেন তো তিনি সেখানে ছুটে গিয়ে গোর খননে শামিল হয়েছেন। এমনও হয়েছে, ভীষণ জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় তিনি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না। কিন্তু কারও মৃত্যু সংবাদ তার কানে এসেছে, সে অবস্থায় তিনি কবরস্থানে ছুটে গিয়ে তার গোর খনন করেছেন।

তার মতে, মানুষের জন্য এমনিতে কিছু করতে না পারলেও তার শেষ ঠিকানাটা তো সাজিয়ে দিতে পারছেন। আর এটাই তার সুখ। মনু মিয়া জানান, এ কাজ করতে গিয়ে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পাচ্ছেন, এটাও তার পরম শান্তির। তাই শরীরে শক্তি-সামর্থ্য থাকলে আমৃত্যু এ কাজটি তিনি চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রাখেন। তার কোনো সন্তান নেই। মানুষের ভালোবাসাই তার একমাত্র সম্বল। তথ্যসূত্র: সমকাল।

আরো পড়ুন
© All rights reserved © 2019 Business Studio
Theme Developed BY Desig Host BD