1. info@businessstdiobd.top : admin :
রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ০২:০৫ পূর্বাহ্ন




রুপকথার ফাগুন দেখতে যাবেন শিমুল বনে!

‘সে এক রূপকথারই দেশ, ফাগুন যেথা হয় না কভু শেষ’—এই গানের কলি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে সেই শিমুলবনে। সেখানে গেলে লিখতে হবে নতুন গান—এ এক ফাগুনেরই বন, শিমুল যেথা রাঙায় সবার মন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের শিমুলবাগানে এখন এভাবেই প্রকৃতি যেন গাইছে ফাগুনের গান।

পর্যটকদের বেড়ানোর যে কটি গ্রুপ ফেসবুকে আছে, তাদের একটি গ্রুপে শেয়ার হয় তাহিরপুরের শিমুলবাগানের ছবি। ছবি দেখে মনে পড়ে যায় ২০১১ সালের কথা। ওই বছর ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে আমরা কয়েকজন মিলে তাহিরপুর শিমুলবাগানে যাই। তখন গাছ ছিল ছোট আর ফুলও আসেনি। এরপরও সেই সবুজ বন ভালো লেগেছিল। এই কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলে গেছে শিমুলবাগানের দৃশ্যপট। সমবয়সী সব গাছে একসঙ্গে ফুল ফুটেছে। কল্পনা করতেই চোখে ভাসতে শুরু করল বাগানের সৌন্দর্য।

২২ ফেব্রুয়ারি সেখানে যাওয়ার বিষয়ে মনস্থির করলাম। সিলেটের বন্ধু আরাফাত ও সুজনও শিমুলবাগানে যাওয়ার কথা শুনে উত্তেজনা দেখালেন সেখানে যাওয়ার। বাসে করে পৌঁছে গেলাম সুনামগঞ্জ। সেখানে আরাফাত ও সুজন যোগ দিলেন। চারজন মিলে অটোরিকশায় করে এলাম তাহিরপুরে। কয়েক বছর আগেও তাহিরপুরে থাকার হোটেল ছিল না। স্ত্রী আইরিনের সহকর্মী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তানভীর সব ঠিক করে রেখেছিলেন। তিনি বললেন, হোটেল টাঙ্গুয়া ইন নামে নতুন এক হোটেল হয়েছে। ভাড়াও বেশি না। দুই বিছানার কক্ষ মাত্র ৬০০ টাকা। হোটেলে উঠে ব্যাগ রেখে ক্যামেরা নিয়ে বের হলাম। মোটরসাইকেলে করে সেখানে যেতে হয়। পথে ভাঙা রাস্তা, ধুলা মারিয়ে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চলে এলাম বাগানে।

স্থানীয় দুই শিক্ষার্থী আজমান আর অমিয় যোগ দিলেন আমাদের সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, এই বছরই সবচেয়ে বেশি ফুল একসঙ্গে ফুটেছে। তাঁরাই ফেসবুকে এই বাগানের হালনাগাদ খবর জানাচ্ছিলেন।

বাগানে পা রেখে ফুলের সমারোহ দেখেই ভ্রমণের ক্লান্তি, ধূলিধূসরিত হওয়ার বিরক্তি যেন উবে গেল। খুশিতে একেকজন যেন লাফ দেওয়া শুরু করল! প্রতিটা গাছই ফুলে ফুলে ভরা। টকটকে লাল শিমুল ফুল যেমন আছে, তেমনি হালকা কমলা রঙের ফুলও দেখা মিলল। বাগানের চারদিকেই বেশ ভিড়। কয়েক দিন থেকে ফুল দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করেছে।

বিশাল সে শিমুলবাগানের এক প্রান্তে দাঁড়ালে অন্যপ্রান্তে দেখা যায় না। সারিবদ্ধভাবে এত পরিকল্পনা করে বাগানটি তৈরি করা না দেখলে এর সৌন্দর্য আঁচ করা কষ্টকর। ডালে ডালে মধু খেতে আসছে বুলবুলি, কাঠশালিক, হলদে পাখিরা। পাখির কিচিরমিচির ডাক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বাগানে। থেকে থেকে ফোটা ফুল মাটিতে পড়ছে, থপ করে শব্দ হচ্ছে। এ যেন সত্যিই রূপকথার এক রাজ্য।

এই বাগান জয়নাল আবেদীনের শিমুলবাগান নামেই পরিচিত। তিনি মারা গেছেন। তাঁর বড় ছেলে সাবেক চেয়ারম্যান মো. রাখাব উদ্দিন বললেন ১৬ বছর আগের কথা। ‘আমার বাবা বাদাঘাট (উত্তর) ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন নিজের প্রায় ২ হাজার ৪০০ শতক জমি বেছে নিলেন শিমুলগাছ লাগাবেন বলে। সে জমিতে তিনি প্রায় তিন হাজার শিমুলগাছ লাগালেন। দিনে দিনে বেড়ে ওঠা শিমুলগাছগুলো এখন হয়েছে শিমুলবাগান। মূলত তাঁর মাথায় ছিল এমন আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলবেন, যা হবে দেশের অনন্য বেড়ানোর জায়গা।’

শিমুলবাগান থেকে আমরা চলে গেলাম পাশেই আরেক পর্যটন স্থান বারিকটিলা। উঁচু এই টিলার ওপর থেকে দেখা যায় ভারতের মেঘালয়ের বড় বড় পাথুরে পাহাড়। নিচে বাংলাদেশের সীমান্তে আশ্চর্য সুন্দর জাদুকাটা নদী। স্বচ্ছ পাথুরে এই নদীর একদিকে টলটলে পানি আর গভীর অংশে সবুজ পানি। এক নদীতে যেন দুই রঙের পানি। মানুষ ছোট ছোট নৌকায় করে নদী থেকে পাথর আর কয়লা তুলছে। সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। পর্যটকেরা ছবি তুলছে। ঘুরছে-ফিরছে এদিক-সেদিক। সেদিকে যেন স্থানীয়দের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই!

রাতে হোটেলে ফিরে সবার মন কিছুটা খারাপ। মোটরসাইকেলচালকদের তাড়াহুড়ার কারণে ফুলের বাগান দেখে আমাদের মন ভরেনি! পরদিন সকাল টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে দুপুরের মধ্যেই হোটেলে ফিরে এলাম। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হলো, আবার শিমুলবাগানে যাব। হোটেল থেকে পাক্কা এক ঘণ্টার পথ। ধুলা আর ভাঙাচোরা পথ। তারপরও শিমুলবাগান আমাদের টানছে। যেই ভাবা সেই কাজ। এবার মোটরসাইকেলচালককে বললাম, আমরা আমাদের মতো ঘুরব তাড়া দিতে পারবেন না। চালক সায় দিলেন।

সেই ধূলিময় ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে বিকেলের নরম রোদে পা রাখলাম বনে। পর্যটক তেমন নেই বললেই চলে। চারদিকে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা। বিকেলের রোদে যেন বাগান অন্য রকম এক রূপ ধারণ করেছে। এবার সন্ধ্যা নামার কিছুটা আগেই ফিরব বলে ঠিক করলাম। পুরোটা বিকেল অসাধারণ কিছু সময় কাটালাম আমরা। সেই ভালো লাগা যেন প্রথমবারের অপূর্ণতাকে ভরিয়ে দিল। ভালো এক অনুভূতি নিয়ে শিমুলবন ছাড়ার আগে বিড়বিড় করে বলতে থাকলাম, প্রথমবার ফুল দেখতে এসেছি, শেষবার নয়! আবার দেখা হবে!

কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে সড়কপথে বাসে করে সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জে নেমে আব্দুজ জহুর সেতু থেকে মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে সরাসরি জয়নাল আবেদীনের শিমুলবাগান। সেখান থেকে পাশেই বারিকটিলা ও জাদুকাটা নদী।

তথ্যসুত্র: প্রথমআলো ডটকম।




আরো পড়ুন




© All rights reserved © 2019 Business Studio
Theme Developed BY Desig Host BD