1. info@businessstdiobd.top : admin :
শুক্রবার, ০৬ অগাস্ট ২০২১, ০৪:০০ পূর্বাহ্ন

‘শেখপাড়া লোহাপট্টি’ দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে বড় পাইকারী লোহার বাজার!

দেশের অন্যতম বৃহত্ লোহার বাজার হিসাবে সুপরিচিত খুলনার ‘শেখপাড়া লোহাপট্টি’। লোহা-লক্কড়ের কান ফাঁটানো শব্দ এবং ক্রেতা-বিক্রেতা আর শ্রমিকদের পদভারে দিনভর জমজমাট থাকে এই লোহাপট্টি। এখানে ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক লোহার দোকান গড়ে উঠেছে। এক একটি দোকানে লাখ থেকে কোটি কোটি টাকার লৌহজাত মালামাল রয়েছে।

এ মার্কেটে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মালামাল কেনাবেচা হয়। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে দোকানপাট। দূর-দূরান্ত থেকে শত শত খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী এই বাজার থেকে তাদের চাহিদামত লৌহজাত দ্রব্য কেনাকাটা করেন। এছাড়া এই বাজার থেকে বৃহত্তর খুলনা বিভাগসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গে লৌহজাত মালামাল সরবরাহ করা হয়।

শেখপাড়ার এই লোহার মার্কেটের ওপর ভিত্তি করে এখানে পাঁচ সহস্রাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সেই সঙ্গে অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান হয়েছে আরো দশ সহস্রাধিক মানুষের। মার্কেটের কারণে এই এলাকায় বাসাবাড়ি এবং দোকান ঘরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

যেভাবে শুরু: ১৯৬৫ সালের দিকে আবু হানিফ নামে একজন লোহা ব্যবসায়ী নগরীর খানজাহান আলী রোডের ফেরিঘাট মোড়ে প্রথমে একটি পুরাতন লোহার মালামালের দোকান দেন। ব্যবসাটি লাভজনক হওয়ায় আবু হানিফের পাশাপাশি বুচাই রহমান, নূরু চৌধুরী, আব্দুল কাদের ও পরশ আলীসহ আরো বেশ কয়েকজন ব্যক্তি এই ব্যবসায় নামেন।

১৯৭০ সালের দিকে এই ব্যবসার দ্রুত প্রসার ঘটে। তখন ফেরিঘাট থেকে এই ব্যবসা পাশের শেখপাড়া মেইন রোডে চলে আসে। বর্তমানে এই লোহার বাজারটি প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। এছাড়া লোহার মার্কেটকে কেন্দ্র করে এই এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ওয়ার্কশপ, স্টিল, ফার্নিচার ও হার্ডওয়ারের দোকান।

মহাকর্মযজ্ঞ: লোহাপট্টিকে ঘিরে পুরো শেখপাড়া এলাকায় প্রতিদিন দিন-রাত চলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মহাকর্মযজ্ঞ। প্রতিদিন ভোর থেকে শ্রমিকদের কেউ ব্যস্ত ট্রাক থেকে মালামাল ওঠানামা করতে, কেউ ব্যস্ত মেশিন দিয়ে বড় বড় লোহার রড কাটতে। কেউবা ব্যস্ত মেশিন দিয়ে বড় বড় লোহার রড সোজা করতে। আবার কুলি, মজুর, ট্রাক, ভ্যান ও ঠেলাগাড়ী শ্রমিকরা ব্যস্ত মালামাল ওঠানামা ও পরিবহন করতে। যেন কারো দম ফেলানোর ফুরসত নেই। সবাই ব্যস্ত যার যার কাজে।

রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে মূলত পুরাতন লোহা সংগ্রহ করা হয় শেখপাড়া লোহাপট্টিতে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ কাটা লোহার মালামাল আনা হয় ট্রাকে করে। এছাড়া পুরাতন বার্জ, কার্গোর বিক্রি করা লোহার মালামাল এবং খুলনাসহ আশপাশ এলাকার যেসব পুরাতন ভবন ভাঙ্গা হয় সেসব ভবনের বিক্রি করা লোহার মালামালও এখানে কেনা হয়। আবার নিলামের মাধ্যমেও এখানকার ব্যবসায়ীরা পুরাতন লোহার মালামাল কিনে থাকেন।

কোথায় যায় এত লোহা:এই সব লোহার মালামাল শেখপাড়া লোহাপট্টি থেকে বৃহত্তর খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর জেলাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও সমগ্র উত্তরবঙ্গে সরবরাহ করা হয়। তবে বর্তমানে উত্তরবঙ্গে বেশ কয়েকটি মার্কেট গড়ে ওঠায় সেখানে আগের তুলনায় মালামাল সরবরাহ অনেকটা কমে গেছে। এছাড়া বড় বড় হাট-বাজার এবং উপজেলা সদরের স্টিলের দোকানদাররাও শেখপাড়া থেকে তাদের চাহিদামত লৌহজাতদ্রব্য সংগ্রহ করে থাকেন।

কর্মসংস্থান: শেখপাড়ার লোহার মার্কেটের ওপর ভিত্তি করে মালিক-শ্রমিক, কুলি-মজুর মিলিয়ে পাঁচ সহস্রাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সেই সঙ্গে অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান হয়েছে আরো দশ সহস্রাধিক মানুষের। মার্কেটের কারণে এই এলাকায় বাসাবাড়ি এবং দোকান ঘরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের বাসাবাড়ি ও দোকান ঘর ভাড়া দিয়ে মাসে মাসে মোটা অঙ্কের টাকা রোজগার করছেন। এই ভাড়ার টাকা দিয়ে তারা স্বাচ্ছন্দ্যেই সংসার চালাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাশেম শেখ জানান, এই লোহার মার্কেটের কারণে শেখপাড়া এলাকার কোনো ব্যক্তি এখন আর বেকার নেই। সোহরাব, জয়নাল, রোস্তম, চাঁন মিয়াসহ বেশ কয়েকজন ভ্যান ও ঠেলাগাড়ি শ্রমিক বলেন, ‘লোহা-লক্কড়ের কাজ করা কঠিন। তারপরও এই লোহার মার্কেটে কাজ কইরা আমরা পরিবার লইয়া মোটামুটি ভালোই আছি। প্রত্যেকদিন আমাগের দুই-চারশ টাহা আয় হয়। আবার কুনো কুনো দিন আমরা এ্যাহাকজন (একেকজন) হাজার টাহাও আয় করি।’

সমস্যা :লোহা ব্যবসার কারণে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হলেও পরিবেশ ও শব্দ দূষণের জন্য এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। শ্রমিকদের লোহা কাটা ও হাতুড়ি পেটা, লোহা-লক্কড়ের কান ফাটানো শব্দ এবং ক্রেতা-বিক্রেতা আর শ্রমিকদের চেঁচামেচির কারণে শেখপাড়া এলাকায় শব্দদূষণ চরমে উঠেছে। লোহার ঝনঝন শব্দে মানুষের শ্রবণ শক্তি হ্রাস পাচ্ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ শব্দ দূষণের কারণে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। উচ্চশব্দের কারণে সন্ধ্যার পরও শিক্ষার্থী ঠিকমত লেখাপড়া করতে পারে না। আবার রাতের বেলা মানুষ ঠিকমত ঘুমাতেও পারে না। শব্দ দূষণের কারণে হূদরোগে আক্রান্ত রোগী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের সব সময় অসুবিধার মধ্যে থাকতে হয়। এছাড়া দিনের বেলায় ট্রাক, ভ্যান ও ঠেলাগাড়ির চাপে শেখপাড়া মেইন রোডসহ গোটা এলাকায় যানজট লেগেই থাকে।

ব্যবসায়ীরা যা বলেন: লোহাপট্টির বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, লোহার ব্যবসা করে আমি পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোই আছি। তিনি জানান, শেখপাড়া বাজারে লোহার ব্যবসা করে শত শত ব্যবসায়ী সাবলম্বী হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকে শূন্য থেকে কোটিপতি হয়েছেন। আবার ভুলের কারণে কেউ কেউ দেউলিয়াও হয়েছেন। তবে এর সংখ্যা খুবই কম।

আশা ট্রেডার্সের মালিক শেখ আহম্মেদ আলী জানান, আমি এই ব্যবসার সঙ্গে প্রায় ২৫ বছর ধরে জড়িত। আগে ঢাকা ও ফরিদপুরের ব্যবসায়ীরাই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে বর্তমানে স্থানীয়রাও এই ব্যবসায় আসছেন। খাদিজা আয়রন স্টোরের মালিক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, এটি দেশের বৃহত্ একটি লোহার মার্কেট হলেও এখানে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নেই। নেই চাঁদাবাজি।

ব্যবসায়ীরা শান্তিপূর্ণভাবেই এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। তিনি বলেন, শুনছি এখান থেকে মার্কেট সরিয়ে নগরীর জোড়াগেট এলাকায় নেয়া হবে। কিন্তু সেখানে নিলে এই ব্যবসায় বিরূপ পভাব পড়বে। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে তিনি জানান। তথ্যসূত্র:

আরো পড়ুন
© All rights reserved © 2019 Business Studio
Theme Developed BY Desig Host BD